বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতার শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে ঘিরে দলটির সমর্থকদের মাঝে সরকার গঠনের স্বপ্ন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এটিই দেশের প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিষিদ্ধ থাকায় এবারের লড়াই মূলত বিএনপি বনাম জামায়াত ও ইসলামপন্থী দলগুলোর জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে জামায়াতের জনপ্রিয়তার ব্যাপক উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের জরিপে বিএনপির সমর্থন ৩৩ শতাংশ হলেও জামায়াত ২৯ শতাংশ ভোট নিয়ে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে। দেশীয় সংস্থাগুলোর জরিপে এই ব্যবধান আরও সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। গত ১৫ বছরের কঠোর দমন-পীড়ন, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি এবং দীর্ঘ সময় নিষিদ্ধ থাকার পর জামায়াতের এই ঘুরে দাঁড়ানোকে বিশ্লেষকরা একটি বড় ধরনের ‘রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখছেন। দলটির দাবি, দীর্ঘদিনের জুলুম ও ত্যাগের কারণে জনগণের একটি বড় অংশ এখন তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় দীর্ঘ সময় সমালোচনার মুখে ছিল। তবে ১৯৭৯ সালে রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাওয়ার পর থেকে তারা সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। এবারের নির্বাচনে জামায়াত নিজেদের ‘মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সমালোচকরা শরীয়া আইন বা নারী অধিকার নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও জামায়াত তা নাকচ করে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈচিত্র্যময় ইমেজ তৈরিতে এবার তারা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিদ্যাপীঠগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাম্প্রতিক ভূমিধস বিজয় দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও তরুণ প্রজন্মের সমর্থনকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ভোটারদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চিরাচরিত ক্ষমতার দ্বৈরথে হতাশ হয়ে এখন জামায়াতকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল অর্জনের পথে রয়েছে। তবে এককভাবে সরকার গঠন করা এখনো চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা মনে করছেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে উষ্ণতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আসন্ন নির্বাচনের রায় আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে সংস্কার ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতির ওপরই বেশি নির্ভর করবে।