১৯৯৫ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে হলভর্তি দর্শকের উপস্থিতিতে ‘‘ মানুষের মানচিত্র’’ শিরোনামে একক আবৃত্তি সন্ধ্যা করেন এক যুবক। তারপর থেকে বিভিন্ন মঞ্চে আবৃত্তি পরিবেশনের জন্য তিনি ছিলেন একজন দর্শক কাঙ্খিত আবৃত্তিশিল্পী। গত ২০ নভেম্বর ২০২৫-এ ছিল তাঁর ৫৫তম জন্মবার্ষিকী। তিনি আর কেউ নন- বর্তমানের সব্যসাচী আবৃত্তিশিল্পী জাহান বশীর। কেউ বলেন আবৃত্তির রাজপুত্র, কেউ বলেন বরপুত্র। জানালেন তাঁর কণ্ঠের চর্চা ছিল ১৯৮৮ সাল থেকেই। ৫৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকার মিরপুরে মৈতালি শিল্পাঙ্গন, বিশ্বভরা প্রাণ, জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশনসহ কয়েকটি সংগঠন তাঁকে নিয়ে আয়োজন করেছে বিশেষ আবৃত্তির অনুষ্ঠান ‘অনন্ত অমৃতময়’। সে সুযোগে বিডি রিপোর্ট এর পক্ষ থেকে কথা হলো তাঁর সঙ্গে-
জাহান বশীর এর আবৃত্তি নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যেমন রয়েছে ভাব বৈচিত্র্যময়তা, তেমনি তাঁর অন্যান্য সৃজনকর্মও বিষয় বৈচিত্র্যতায় ভরপুর। তিনি একাধারে শিশুতোষ লেখক এবং শিশু সংগঠক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন কয়েক যুগ। নব্বইয়ের দশকে শিশুদের নিয়ে তিনি লিখেছেন শিশুতোষ নাট্য সিরিজ ‘‘গাবলুর যাদুগিরি’’। প্রত্যেক খণ্ডে রয়েছে আলাদা কাহিনী, আলাদা গল্প ও শিরোনাম। তিনি এ সিরিজকে চাইল্ড এডুটেইনমেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তন্মধ্যে; গুবলেট, মন ভালো ঘর, চু-কিত কিত, বন্ধুর চিঠি, হারিয়ে যাবার নেই মানা, চাঁদ মামা সূয্যি মামা, দেখোরে নয়ন মেলে উল্লেখযোগ্য। ছোটদের জন্য সহজ করে আবৃত্তি শেখার কলাকৌশল নিয়ে লিখেছেন ‘আবৃত্তি শেখো মজা করে’। শৈলী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি ২০০০ সালের দিকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছোটদের জন্য অনেক গান লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা গান নিয়ে ১৯৯৮ সালের দিকে ‘সারাদিন স্বপ্ন আঁকি’ শিরোনামে একটি এ্যালবামও প্রকাশ হয় শিশুশিল্পীদের কণ্ঠে। বেতার ও টেলিভিশনে শিশুদের নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান গ্রন্থনা ও পরিচালনা করেছেন তিনি।
আবৃত্তির আধুনিকোত্তর ধারা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তিনি লিখেছেন ‘আবৃত্তি নির্মাণ ও প্রয়োগ’ বিষয়ক আবৃত্তির গবেষণা গ্রন্থ। এছাড়াও জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত তাঁর একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অনার্যনামা’, দুই বাংলার লোক সাধারণের কবিতা সংকলন’, আবৃত্তির সমকালীন কবিতা সংকলন, কাব্যোপন্যাস ‘রোদবিন্দু’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে ইতোমধ্যে।
লেখালেখি ছাড়াও তিনি একজন সুদক্ষ সংগঠক হিসেবে ইতোমধ্যে অনেকের কাছে ব্যাপক পরিচিত। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পী সাহিত্যিক সম্মিলিত পরিষদ ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ এর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে সৃজনশীল প্রকাশকদের মধ্যে জাহান বশীর একটি বিশেষ জায়গা করে করে নিয়েছেন। তাঁর জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশন থেকে ইতোমধ্যে শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। সম্পাদনা করছেন লিটলম্যাগ ‘বিশ্বভরা প্রাণ”।
পেশাগতভাবে তিনি ১৯৯৭ সালে সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছেন। পরবর্তীতে ২০০২ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘মা ও শিশুর উন্নয়নে যোগাযোগ কার্যক্রম’ এর বিভাগীয় সমন্বয়ক ছিলেন। বর্তমানে মুক্তভাবে নির্মাণ করছেন উন্নয়নমূলক তথ্যচিত্র। এ যাবৎ তিনি প্রায় ২০০টির উপরে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভির পক্ষ থেকে কথা বলছিলাম তাঁর বর্ণাঢ্য সৃজনময় সাংস্কৃতিক যাপিত জীবন নিয়ে-
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় আপনার বিচরণ, কোনটিকে প্রাধান্য দেন?
- মন যখন যেটিতে সায় দেয়, তাই-ই করি। এক সময় শিশুদের নিয়ে খুব লিখতাম, ভাবতাম। তারাই ছিলো আমার ধ্যান জ্ঞান। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে। ধীরে ধীরে বড়দের সংগঠনে যুক্ত হয়ে পড়ি। বিশেষত আমার আবৃত্তি চর্চার কারণে।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : লেখালেখির শুরু কিভাবে এবং কখন থেকে?
-লেখালেখির চেয়ে পড়তে আমার বেশি ভালো লাগে। তবে প্রয়োজনবোধেই সম্ভবত লেখালেখির শুরু। আর সেটি ছোটদের নিয়ে। হয়তোবা লেখার বোধটা কখন যেন আমার ভেতরে প্রোথিত হয়ে গেছে টেরই পাইনি। মূলত ১৯৮৮ থেকে শিশুদের সাথে থিয়েটারের কাজ করতে গিয়ে তাদের উপযোগী নাটক লেখার ইচ্ছে জেগেছিল। তখন কিছু নাটক লিখেছিলাম। পরবর্তীতে সে নাটকগুলোর জন্য ছড়া এবং ছড়াগানের প্রয়োজনবোধে প্রতিটি নাটকে ছড়া এবং ছড়াগান যুক্ত করেছিলাম।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : শিশুদের নিয়ে আপনার লেখা এবং কাজ সম্পর্কে কিছু বলুন।
-শিশুদের নিয়ে প্রায় পঞ্চাশটির মতো নাটক ও গল্পের বই লিখেছি। ছোটদের গানের এ্যালবাম ‘সারাদিন স্বপ্ন আঁকি’ শিরোনামে বেরিয়েছিল ১৯৯৮ সালে। আমার গ্রন্থনা ও পরিচালনায় বিভিন্ন টিভিতে ছোটদের মিউজিক্যাল ড্রামা সম্প্রচার হয়েছে শতাধিক। শিশুদের নিয়ে আবৃত্তি প্রযোজনাও করেছি কয়েকটি।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আমরা জানি, আবৃত্তিশিল্পের একটি নতুন ধারা আপনি সৃষ্টি করতে চাইছেন। সেই ধারাটা কেমন?
-কবিতার ভাষা থেকে আবৃত্তির ভাষা আলাদা করা। কবির কবিতার বোধ আবৃত্তিশিল্পীর কাছে ধরা দেবে নতুন ভাব মেজাজে। ভরত নাট্যমে উল্লিখিত নয়টি রসের যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে এবং কণ্ঠে প্রক্ষেপণের মাধ্যমে কবিতার নতুন প্রাণ জেগে উঠবে আবৃত্তির মাধ্যমে।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আপনার আবৃত্তির শ্রোতা কারা?
-সাধারণ কবিতাপ্রেমি মানুষ।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : বাংলাদেশে আবৃত্তিশিল্পের কেমন প্রসার ঘটছে বলে মনে করেন?
-আবৃত্তিশিল্পের চর্চা মূলত সাংগঠনিক পর্যায়ে বেশি হয়। কিন্তু সেখান থেকে গত কয়েক দশকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন আবৃত্তিশিল্পী বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে কিছু তরুণ সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে পরিচিতি অর্জন করছে। তবে সামগ্রিকভাবে গড়পড়তায় সবাই নিজেকে আবৃত্তিশিল্পী দাবি করছে, এটা শুধু আবৃত্তি নয়, যে কোন সৃজন শিল্পের জন্য এটি অশনি সংকেত।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : তাহলে বাংলাদেশে আবৃত্তির প্রসার হচ্ছে না বলে মনে করছেন?
-এখন যা চলছে, এটিকে আবৃত্তিশিল্পের প্রসার বলবো না। আবৃত্তির জোয়ার বলতে পারেন। শিল্পের প্রসার তেমন নেই। আর যে কোন জোয়ারে খড়কুটোতো থাকতেই পারে। দু চারজন ছাড়া মূল শিল্প ধরে কেউ এগোচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : এমন মনে হওয়ার কারণ কি?
-কিছুটা সাংগঠনিক সংকীর্ণতা, কিছুটা আবৃত্তি অনুশীলনকারীদের উচ্চাকাঙ্খী মনোভাবের কারণে।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করুন।
-সাংগঠনিক সংকীর্ণতা বলতে এটাই বলতে চাইছি। অগ্রজরা নবীণদেরকে স্থান করে দিতে বড্ড কার্পণ্য করেন। দেখবেন, প্রত্যেক সংগঠনের প্রধানরাই বিভিন্ন মঞ্চ দখল করে থাকেন। জুনিয়রদেরকে তেমন সুযোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। বৃন্দ বা সমবেত আবৃত্তির মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখেন জুনিয়রদেরকে। অনেক নেতৃবৃন্দ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ভোগ করার জন্য ব্যস্ত থাকেন। বিগত সময়ে তাই দেখে আসছি। কর্মীরা এসবের ধারে কাছেও নেই। এতে করে একক শিল্পী তৈরি হচ্ছে না।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : সাংগঠনিকভাবে আবৃত্তিকে এগিয়ে নেয়ার প্রসেসটা কি?
-প্রসেস অনেক রকম থাকতে পারে। তবে সংগঠন বা আবৃত্তির মোর্চাগুলোর নেতৃবৃন্দকে রাজনৈতিক তোষামোদ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। আবৃত্তিশিল্পের ধ্যানে মগ্ন থাকতে হবে। তরুণদেরকে জায়গা করে দিতে হবে। তাদের মাধ্যমে আমরা নতুনত্ব পেতে পারি। সত্যিকারের প্রসার আশা করতে পারি।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আবৃত্তি কি রাজনীতির বাইরে?
-কোন শিল্পই রাজনীতির বাইরে নয়। আবৃত্তিও নয়। রাজনীতি যেখানে আছে, সেখানে কবিতা বা সাহিত্য থাকবে। কবিতা বা সাহিত্য যেখানে আছে, সেখানে আবৃত্তি থাকবে। কবিতা সব সময় নিপীড়নের বিরুদ্ধে, অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে, অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে অবস্থান করবে। আবৃত্তিও তেমনভাবেই সকল অপশক্তির বিপক্ষে থাকবে।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আবৃত্তির ধ্যান এর কথা বললেন, সেটা কিভাবে সম্ভব?
-কবিতার ভাষা থেকে আবৃত্তির ভাষাকে আলাদা করে আবৃত্তির নিজস্ব ভিত তৈরি করা। ভাববাদের জায়গা থেকে সরে এসে বাস্তববাদের সাথে আবৃত্তিকে যুক্ত করা। আবৃত্তির প্রাচীন ও আধুনিক ধারাকে ভেঙে উত্তর আধুনিক ধারায় আবৃত্তিকে রূপান্তর করা।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আবৃত্তিশিল্পী হতে গেলে কী কী গুণ প্রয়োজন?
-প্রথমত একজন সৃজন মানসিকতার মানুষ হতে হবে। হিংসা, লোভ, অহংবোধসহ জাগতিক অপমোহ ত্যাগ করতে হবে। তবে সংসার বিবর্জিত নয়। কবিতার প্রতি, মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। তারপর বৈয়াকরণিক কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে সেগুলো চর্চা করতে হবে নিয়মিত। কণ্ঠের ভিত তৈরি করতে হবে কঠোর চর্চার মাধ্যমে। বাংলাভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ থাকতে হবে। তবেই আবৃত্তিকে শিল্প হিসেবে আমরা দাঁড় করাতে পারবো এবং নিজেকে আবৃত্তিশিল্পী বলতে পারবো।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আপনি নিজেই সংগঠক। আপনার সাংগঠনিক মতাদর্শ কি?
- আমি একজন সচেতন নাগরিক। বাংলাভাষার শুদ্ধ চর্চা এবং বাংলার সংস্কৃতিকে ধারণ করাই আমার সাংগঠনিক মতাদর্শ। আমার সংগঠন বিশ্বভরা প্রাণ। বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষ আছে, তারাই আমার আরাধ্য ব্যক্তি। সবার সৃজন মানসিকতা আলাদা। কিন্তু চাহিদা এক। দেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করছি। এটাই আমার ব্রত।
স্টার টোয়েন্টিফোর টিভি : আপনার সাহিত্য- সংস্কৃতি চর্চা আপনার পেশাগত কাজকে কি কখনো প্রভাবিত করে?
-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার দুটো দিক আছে। একটি হলো শখের, আরেকটি হলো পেশাগত। শখের যারা রয়েছেন, তারা সব কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলে চর্চা করেন। আর পেশাগত সাহিত্য-সংস্কৃতির মানুষরা এটা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন। আমি শখ থেকে এটিকে পেশাগতভাবে নিয়েছি। তাই ভীষণভাবেই সাহিত্য-সংস্কৃতি আমাকে প্রভাবিত করে। আমার প্রকাশনা ও প্রযোজনা সংস্থা রয়েছে- জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশন। এর মাধ্যমে আমি আবৃত্তিকে মার্চ করে দিয়েছি। লেখালেখির চর্চাকেও মার্চ করেছি। আমি তথ্যচিত্র নির্মাণ করি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে। সেটাও জ্ঞানসঙ্গীর আওতায়। তাই আমি সার্বক্ষণিক সাহিত্য-সংস্কৃতির মানুষ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এটা নিয়েই আমাকে থাকতে হবে।
