এ এস এম সাইফুল্লাহ :
মানিকগঞ্জ-যে জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই শান্ত ও স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত, সেই জেলাকে নাড়িয়ে দিয়েছে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের বিতর্কিত মন্তব্য।
ঘটনা ৪ নভেম্বর, ঘিওরের জাবরা খালা পাগলির মেলামঞ্চ। গান পরিবেশন করতে গিয়ে আল্লাহ ও ইসলামের বিরুদ্ধে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ও আপত্তিকর মন্তব্য করেন তিনি। মুহূর্তেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেশজুড়ে ক্ষোভের আগুন। মুসল্লিদের দাবী—“এই অপরাধীকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।”
আইনের দ্বারস্থ ধর্মপ্রাণ জনগণ :
ঘটনার পর ২০ নভেম্বর ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বাদী হয়ে মামলা করেন। সেদিনই মাদারীপুর থেকে ডিবি পুলিশ আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল-এত উত্তেজনার আগেই কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হলো না? প্রশাসন কি দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখিয়েছে?
আইনবিদদের চোখে অপরাধ স্পষ্ট :
ভয়েস অব লয়ার্স এর প্রধান সমন্বয়ক, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী আশরাফ-উজ-জামান বলেন, “এটি স্পষ্ট ধর্ম অবমাননা। দণ্ডবিধি ২৯৫(এ)-তে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাকে যেকোনো সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করতে পারত।”
মানিকগঞ্জের সর্বস্তরের আলেম ওলামাদের সংবাদ সম্মেলন :
সংবাদ সম্মেলনে আলেম-ওলামারা জানান, গত ২৩ নভেম্বর সাড়ে ৯টার দিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের রাজ হোটেলের সামনে থেকে আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি পুলিশের উপস্থিতিতে নির্ধারিত রুট অনুসরণ করে বিজয় মেলার মাঠের সামনে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে সমাবেশের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। এমন সময় শিল্পী আবুল সরকারের অনুসারীরা বিজয় মেলার মাঠে জটলা পাকিয়ে অবস্থান করছিলো। প্রশাসন তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিলেও তারা খানিক দূরে গিয়ে অবস্থান নেয়। তাদের অবস্থানে এক ধরনের উসকানি ছিলো। এক পর্যায়ে দূর থেকে তাদের মারমুখী অবস্থা লক্ষ করা গেলে সমাবেশের পেছন দিকের বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষোভে ফুসে ওঠে। নেতৃস্থানীয় কয়েকজন পুলিশদের সাথে নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতাকে সমাবেশস্থলে জড়ো করতে থাকেন। এ সময় বাউলদের পক্ষ হতেও আক্রমণ করা হয় আবার তৌহিদী জনতার সমাবেশ হতে বিক্ষুব্ধ জনতা সংঘর্ষে জড়ায়।
এসময় উভয় পক্ষের কয়েক জন সংঘর্ষে আহত হয়। আমরা আহত সবাইকে দেখতে ও খোঁজ-খবর নিতে হাসপাতালে যাই। আমরা সবার সুস্থতা কামনা করে দোয়া করি।
বক্তারা বলেন, পুলিশ প্রশাসন বাউলদের সাড়ে ১১টার দিকে শহরের প্রেস ক্লাব চত্বরে মানববন্ধন করার অনুমতি প্রদান করেছে বলে আমরা জানতে পারি। কিন্তু তাদের সময়ের ঘণ্টা খানের আগেই কেন তারা আমাদের নির্ধারিত সমাবেশ স্থলের নিকটে অবস্থান করতে থাকলো? পুলিশ তাদের দূরে সরে যেতে বললেও তার তা অমান্য করে কয়েক গজ দূরে গিয়ে অবস্থান কেন নিলেন? মূলত তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বিশৃঙ্খলা লাগানোর জন্যেই এমনটা করেছে।
শিবালয় উপজেলার শাহিলী গ্রামের জালাল সরকার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছে। তিনি আবুল সরকারের আত্মীয়। বাউলদের পক্ষে মাঠে নামা লোকদের বেশির ভাগই বিগত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদের নেতা-কর্মী। এই আবুল সরকার প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে ভোট চেয়েছেন এবং সাবেক এমপি মমতাজকে মা বলে সন্বোধন করেছেন।
তারা বলেন, ‘সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশৃঙ্খলা তৈরি ও এই বিষয়টিকে নিয়ে দেশে একটা বড় রকমের যড়ষন্ত্র করার চেষ্টা করছে।’
ইসলামি পণ্ডিতরা বলেন, আবুল সরকারের চারটি মন্তব্যই ছিল চরম কুফরি, যা তার ধর্মীয় অজ্ঞতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।
মাওলানা ইসলামাবাদী জানান, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তাকে সঙ্গে সঙ্গেই আইনের আওতায় আনা। বরং প্রশাসন উদাসীন ছিল এবং পরে আবার বাউলদের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে।”
শান্ত জেলায় অশান্তির আগুন :
মানিকগঞ্জের স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষদের মতে, “শান্ত মানিকগঞ্জকে উত্তাল বানিয়েছে আবুল সরকারের মুখের সেই চারটি বাক্য।”
মুফতি আবদুল হান্নান বলেন, “দেশজুড়ে উত্তেজনা থাকলেও মানিকগঞ্জ ছিল শান্ত। আবুল সরকার সেই শান্তিকে ভেঙে দিয়েছে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
পুলিশের মন্তব্য :
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “আল্লাহকে নিয়ে মন্তব্য থেকে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সংঘর্ষের পর আবুল সরকারের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

