মানিকগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রমজান আলীর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির নথি বেরিয়ে আসছে। মেয়র পদে বসার পর থেকেই তিনি পৌরসভাকে বানিয়েছিলেন নিজের আয় ও বিলাসী জীবনের হাতিয়ার।

স্ত্রীর গাড়িকে পৌরসভার গাড়ি বানানো :

দলিল বলছে রমজান আলীর স্ত্রী আফরোজা আক্তারের নামে নিবন্ধিত প্রাডো পাজেরো জিপ (ঢাকা মেট্রো-গ-১৮-২৬২৪) পৌরসভার পরিবহণ তালিকায় ছিল না।
তারপরও ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এই গাড়িকে “পৌরসভার নিজস্ব গাড়ি” দেখিয়ে তেলের বিল তোলা হয়েছে।

মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা করে তিন বছরে ১৫ লাখ টাকার বেশি পৌর তহবিল থেকে আত্মসাৎ।

শুধু ২০২১ সালের আগস্ট-ডিসেম্বর ও ২০২২ সালের জানুয়ারিতেই বিল দেওয়া হয়েছে ২.৫৯ লাখ টাকা, ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর—৫৯ হাজার টাকা,
২০২৪ সালের মার্চ-মে—১.০৬ লাখ টাকা। এখনো বকেয়া আছে ৭৫ হাজার টাকার বেশি।

সাবেক প্রশাসক সানজিদা জেসমিন বলেন : “এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত কাজ। পৌরসভার পরিবহণ তালিকায় এ গাড়ি নেই, অথচ নিয়মিত তেলের বিল দেখানো হয়েছে। এটি বড় ধরনের দুর্নীতি।”

টেন্ডার জালিয়াতি ও পরিবারের বাণিজ্য :

পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ আরও ভয়াবহ। ২০২০-২১ অর্থবছর: ২.৭৭ কোটি টাকার ৭টি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বানের ৫৫ দিন আগে কাজ শুরু করার আদেশ দেন রমজান আলী।
সেই কাজ সরাসরি দেন তার আপন ভাই দেলোয়ার হোসেন ও ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের। তদন্ত কমিটি প্রমাণ পেলেও তার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রতিবেদন চাপা পড়ে যায়।

৪২ কোটি টাকার ভুয়া টেন্ডার :

রমজান আলীর সঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার লাভলু মিয়া জড়িয়ে পড়েন ৪২ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতিতে।
লাভলুর ছেলের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান জনি ট্রেডার্সকে কোটি কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়।

২০১৭-১৮ অর্থবছর: সড়ক নির্মাণ দেখিয়ে ২ কোটির বেশি বিল।
বাসস্ট্যান্ড ও ট্রাক টার্মিনালের নামে ১১ কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছর: ৮.৫১ কোটি টাকা, ২০২০-২১ অর্থবছর: প্রায় ১২ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছর: ৩.৩৫ কোটি টাকা।

তথ্য অধিকার আইনে আবেদনে পৌর প্রশাসক জানান, “জনি ট্রেডার্স নামে পৌরসভায় কোনো কাজই করা হয়নি।”

ভুয়া প্রতিষ্ঠান বানিয়ে টাকা আত্মসাৎ :

রমজান আলী কেবল টেন্ডারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি নিজেই তৈরি করেন ভুয়া সংগঠন-“মেয়র রমজান আলী শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ”।

এই প্রতিষ্ঠানের নামে পৌরসভা থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা অনুদান হাতিয়ে নিতেন। বিল-ভাউচার ঘেঁটে দেখা যায়, কবি কাইয়ূম শাহজীর নামে নিয়মিত টাকা তোলা হতো।

সচিব কাইয়ূম শাহজী নিজেই স্বীকার করেন—“সংগঠন কী কাজ করত, তা সাবেক মেয়রই বলতে পারবেন।” এছাড়া বন্ধুর মায়ের নামে কলেজ বানিয়ে মাসিক অনুদান নিতেন, যা একেবারেই নিয়মবহির্ভূত।

মামলা ও বর্তমান অবস্থা :

এর আগেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৩টি মামলা করেছিল। কিন্তু শিক্ষা নেননি। মেয়র পদে ফিরে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে আছেন। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা চলছে। নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতির স্তূপ।

পৌরবাসীর দাবি—এবার দুদককে যেন সত্যিই মাঠে নামতে হয়। মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রতিটি টাকার হিসাব জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।