পদ্মা যমুনা কালিগঙ্গা নদীর গত কয়েক দিনের অব্যাহত ভাঙনে মাানিকগঞ্জের তিনটি উপজেলায় দেড় সহস্রাধিক পরিবার ভাঙনের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এর মধ্যে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের পাটুরিয়া ফেরিঘাটসহ ৬টি বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে এবং ২২টি পরিবারের বসভিটা সরিয়ে নিয়ে গেছে। দৌলতপুর উপজেলায় ১ হাজার ৫৯১টি পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এছাড়া দৌলতপুর উপজেলার নিজ ভেরেঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনতলা ভবনটি গত ৭জুন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের শিকার হয়ে অনেকেই বাড়ী ঘর হারিয়ে অন্য জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে ভাঙন আতংকে দিন কাটাচ্ছে হরিরামপুর, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার নদীর তীরবর্তী কয়েক হাজার পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতীরে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তাদের দাবি, নদীতীরবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলন বন্ধ হলে ভাঙন অনেকাংশে কমে যাবে।
ত্রাণ ও পূণর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিবালয়ের উপজেলার তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া, কানাইদিয়া, জাফরগঞ্জ, নিহালপুর ও শিবালয় ইউনিয়নের চরশিবালয়, ছোটআনুলিয়া, অন্বয়পুর, ঝড়িয়ারবাগ, দাসকান্দি, এলাচিপুর এবং আরুয়া ইউনিয়নের তুরাবাড়ী, তেঘড়ি, বড়রিয়া, (পাওয়ার প্লান্ট), নয়াকন্দি, মান্ডাখোলা প্রাইমারি স্কুল, দেবীনগর, বাউলীকান্দা গ্রামগুলো নদী তীরবর্তী হওয়ায় বেশী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
শিবালয় উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন জানান, যমুনা নদীর ভাঙনে ইতোমধ্যে ৬ টি পরিবারের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সরিয়ে নেয়া হয়েছে ২২টি পরিবারের বাড়িঘর। এছাড়া পাটুরিয়া ফেরিঘাট ভাঙনের শিকার হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে ফেরিঘাটের আশপাশের এলাকা।
দৌলতপুর উপজেলার অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার চরকাটারি, বাচামারা, বাঘুটিয়া, বাশাইল, রাহাতপুর, জিয়ানপুর, আবুডাঙ্গা, রামচন্দ্রপুর এলাকায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে ১ হাজার ৫৯১ জন পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব পরিবারের সহায়তার জন্য ত্রাণ ও পূণর্বাসন অধিদপ্তরে তালিকা পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হবে।
নদীভাঙনের শিকার শিবালয় উপজেলার তেঘুড়ি গ্রামের ইতি আক্তার বলেন, গত কয়েকদিনের পদ্মার ভাঙনে আমার বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এখন সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কিছুই জানি না। একইগ্রামের আব্দুস সালাম জানান, কয়েকদিন আগেও আমার ঘর ছিল। মুহূর্তের মধ্যে পদ্মানদী সবকিছু কেড়ে নিয়ে গেল। পরিবার নিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, পদ্মা ও যমুনার বিভিন্ন ভাঙন এলাকায় আমরা কাজ করছি। প্রতদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় ভাঙনরোধে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসক (যুগ্ন সচিব) ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে চাল ও শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। যেসব পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে, তাদের ঘর নির্মাণের জন্য টিন সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসের উচ্চমান অফিস সহকারী ইফফাত আরা ইমা বলেন, ইতোমধ্যে শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিস থেকে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের তালিকা পেয়েছি। এর মধ্যে দৌলতপুর উপজেলায় যমুনা নদী ভাঙনের শিকার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৫৯১টি। দৌলতপুর উপজেলার ৬টি পরিবার সম্পূর্ন নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে এবং ২২ পরিবারের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে। বাকি উপজেলার তালিকা এখনো আমাদের অফিসে আসেনি বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের মতে, অস্থায়ী জিওব্যাগ দিয়ে কিছু সময়ের জন্য ভাঙন ঠেকানো গেলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তারা নদীর পাড় রক্ষায় টেকসই ও স্থায়ীবাধ নির্মাণ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। পদ্মার তীব্র স্রোতে বাড়ছে আতঙ্ক। নদীর ধারে রাতেও ঘুমাতে পারছেন না অনেকে। যে কোনো মুহূর্তে ভাঙনের শিকার হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে কয়েক হাজার মানুষের।
